Wednesday , August 21 2019
Home / ফিচার / সাংবাদিকতার নীতিমালা
সাংবাদিকতার নীতিমালা
সাংবাদিকতার নীতিমালা

সাংবাদিকতার নীতিমালা

মোঃ জাহিদুল ইসলামঃ

সাংবাদিক না হওয়া সত্বেও সাংবাদিকতার নীতিমালা নিয়ে লেখার কারণ একটাই, সংবাদপত্রের পাতায় পাতায় নানান ধরনের ভূরি-ভূরি তথ্য পাওয়া গেলেও সাংবাদিকতার নীতিমালা সম্পর্কে তথ্যে-ঘাটতি রয়েছে। লক্ষ্য করবেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় প্রিন্টেড নিউজপেপারের পাশাপাশি অনেক অনলাইন সংবাদপত্র প্রকাশিত হচ্ছে যার লিংক সামাজিক গনমাধ্যমগুলোতে শেয়ার হয়ে থাকে! জেনে অনেকে বলবেন ভালোই তো, এর ফলে অনেক কিছু জানা যাচ্ছে। হ্যাঁ, জানা যাচ্ছে ঠিকই, তবে সংবাদ পরিবেশনের নামে যদি কেউ আপনার বা আপনার আত্বীয়-স্বজন বা স্বদেশের নামে মিথ্যা কুৎসা রটাতে শুরু হয়, তখন কি অনেক কিছু জানা যাচ্ছে ভেবে তৃপ্ত থাকবেন? জেলার অফলাইন-অনলাইন প্রকাশনাগুলোয় চোখ রাখুন, দেখবেন এ ধরণের ঘটনা ঘটছে। এ ধরণের কার্যকলাপ সাংবাদিকতায় নীতিসিদ্ধ কি না, তা পাঠক-শ্রোতা-দর্শক সাধারণের বিবেচনা করার অধিকার আছে, যার জন্য সাংবাদিকতার নীতিমালা সম্পর্কে জানা প্রয়োজন।

সাংবাদিকতার নীতিমালা সর্বসাধারণের কাছে তুলে ধরার উদ্দেশ্য এই মহান পেশাটিকে প্রশ্নবিদ্ধ করা নয় বরং উপরোক্ত নীতিমালা সম্পর্কিত জ্ঞান থাকলে প্রতিনিয়ত সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য নীতিসিদ্ধ কি না, তা নিরুপণে সহজ হবে।

আমি জানি, প্রতিবছর সত্য উদঘাটণ ও পরিবেশন করতে গিয়ে অনেক সাংবাদিক জীবনের ঝুঁকি নিচ্ছেন, নির্যাতিত হচ্ছেন এমন কি মৃত্যু বরণ করছেন। আমার বন্ধু মহলেও সত্যনিষ্ঠ ও বিবেকবান সাংবাদিক রয়েছেন।

সমস্যা সৃষ্টি করে মুষ্টিমেয় কতিপয় ব্যক্তি, যারা এই মহান পেশাটির লেবাসে নানান ছলে অত্যাচার ও অনাচার চালিয়ে জনজীবন অতিষ্ঠ করে তোলে, যার অপর নাম হলুদ সাংবাদিকতা।

 পেশাদারী সাংবাদিকতার নীতিমালাঃ মত প্রকাশের স্বাধীনতা আছে এমন সকল গণতান্ত্রিক দেশেই সাংবাদিকতার নীতিমালা মোটামুটি অভিন্ন। এর ভিতরে ১৯৯৬ সালে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের পেশাদারী সাংবাদিক সোসাইটি কর্তৃক গৃহীত সুলিখিত ও সহজবোধ্য নীতিমালা অবলম্বনে বাংলা অনুবাদের চেষ্টা করছি। (তথ্যসূত্রঃ http://www.spj.org/ethicscode.asp)

 ১। সত্য জানা ও সত্য পরিবেশন করাঃ সংবাদ সংগ্রহ ও তথ্য পরিবেশনার ক্ষেত্রে সত্যনিষ্ঠ, পক্ষপাতবিহীন ও সৎসাহসী হতে হবে।

ক) তথ্য সঠিক ও সত্য হতে হবে। তথ্য অনুমান বর্জনীয়। কোন অবস্থাতেই সত্য গোপণ বা বিকৃত করা যাবে না

খ) যাদের নিয়ে সংবাদের সৃষ্টি তাদের ভালোভাবে জানতে হবে ও তাদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিতে হবে।

গ) তথ্য দাতা সম্পর্কে পরিষ্কারভাবে জানাতে হবে। জনগণ তথ্য দাতার নির্ভরযোগ্যতা সম্পর্কে জানার অধিকার রাখে।

ঘ) তথ্য দাতার সঠিক উদ্দেশ্য ও তথ্যের বিনিময়ে তথ্য দাতা কি আশা করে সেটা জানতে হবে। ওয়াদা ভঙ্গ করা যাবে না।

উ) সংবাদের হেডলাইন, ফটো গ্রাফিক্স, অডিও, ভিডিও ইত্যাদির সাথে মূল সংবাদ সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।

চ) তথ্য, ফটো, ভিডিও ইত্যাদি পরিবর্তন করা, প্রলেপ লাগানো বা বিকৃত করা যাবেনা। ক্যাপশন সত্যনিষ্ঠ হতে হবে।

ছ) মঞ্চন্ সংবাদ পরিহার করতে হবে: অর্থাৎ সাধারণ ঘটনার সংবাদ পরিবেশন করা, সংবাদ পরিবেশন করার জন্য ঘটনা ঘটানো নয়।

জ) ছদ্ম নামে বা ছদ্ম পরিচয়ে সংবাদ সংগ্রহ করা যাবে না। ছদ্ম নাম-পরিচয় ধারণের প্রয়োজন হলে সংবাদে তা উল্লখ করতে হবে।

ঝ) অন্যের সংবাদ নকল করা যাবে না।

ঞ) অপ্রিয় খবরের ক্ষেত্রেও সৎসাহস নিয়ে তা প্রকাশ করতে হবে।

ট) সংবাদ পরিবেশনার ক্ষেত্রে ব্যক্তির সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের প্রতি সম্মান দেখাতে হবে, নিজের মূল্যবোধ চাপিয়ে দেওয়া চলবে না।

ঠ) জাতি, ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ, শারিরীক অক্ষমতা, সামাজিক অবস্থান ইত্যাদি বিষয়ে অবহেলামুলক গহ্বাঁধা বর্ণনা দেওয়া যাবে না।

ড) অপ্রিয় হলেও উন্মুক্ত মত বিনিময় অব্যহত রাখতে হবে।

ঢ) অশ্রুত কণ্ঠস্বর সর্বসাধারণের কানে পৌঁছে দিতে হবে; এ লক্ষ্যে অফিসিয়াল ও আন-অফিসিয়াল উভয় ধরণের তথ্যই গ্রহনযোগ্য।

ণ) তথ্য পরিবেশনের নামে কারো পক্ষে বা বিপক্ষে অকালতি করা যাবে না।

ত) সাংবাদ পরিবেশনার নামে বিজ্ঞাপন প্রচার বা আত্মপ্রচার করা যাবেনা।

দ) মনে রাখতে হবে জনগণের কার্যকলাপে গোপণীয়তার অবকাশ নেই এবং সরকারী নথিপত্র পরীক্ষণ যোগ্য।

২। ন্যুনতম ক্ষতিসাধন করাঃ মনে রাখতে হবে বিষয়, ব্যাক্তি ও সহকর্মী এরাও মানুষ। মানুষের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ থাকতে হবে।

ক) ব্যাক্তি যাতে ক্ষতিগ্রস্থ্য না হয় তা বিবেচনায় রাখতে হবে। অনভিজ্ঞ তথ্যদাতা বিশেষত মহিলা ও শিশুদের বেলায় বিশেষ সতর্কতা প্রযোজনীয়।

খ) শোক বা বিয়োগান্তক সংবাদে ব্যক্তির সাক্ষাৎকার বা ফটো প্রকাশের ক্ষেত্রে সতর্ক হতে হবে।

গ) তথ্য সংগ্রহ ও পরিবেশন কারো কারো জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। সাংবাদিকতা ওঁদ্ধত্য প্রদর্শনের লাইসেন্স নয়।

ঘ) মনে রাখতে হবে ব্যক্তিগত তথ্য অন্যকে প্রদান করা বাধ্যতামূলক নয়, তবে সরকারী কর্মচারীদের এক্ষেত্রে অধিক দায়বদ্ধতা আছে।

ঙ) সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে রুচিশীল হতে হবে। নোংরা বা অশ্লীল বিষয়ে রঙ চড়ানো যাবে না।

চ) যৌণ অপরাধের শিকার কিংবা অপ্রাপ্তবয়ক্ষদের সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে সতর্ক হতে হবে।

ছ) অভিযুক্তের অপরাধ আদালতে প্রমাণিত হবার আগ পর্যন্ত তার তথ্য পরিবেশনে সুবিবেচক হতে হবে।

জ) মনে রাখতে হবে জনগণের যেমন অপরাধ সম্পর্কে জানার অধিকার আছে তেমনি অভিযুক্তের আছে ন্যায় বিচার পাবার অধিকার।

৩। স্বাধীন ভাবে কাজ করাঃ দ্বায়িত্বপালনে কারো প্রতি আনুগত্য স্বীকার বা দায়বদ্ধতা থেকে মুক্ত থাকতে হবে।

ক) তথ্য পরিবেশনে স্বার্থের সংঘাত এড়িয়ে চলতে হবে।

খ) সঙ্গ, দল বা কার্যকলাপ, যাতে সাংবাদিক হিসাবে সুনাম বা বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুন্ন হয়, তা এড়িয়ে চলতে হবে।

গ) অর্থ গ্রহণ, উপহার গ্রহণ, সুবিধা গ্রহণ, বিনামূল্যে ভ্রমণ, রাজনৈতিক সুবিধা বা সরকারি সুবিধা গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকতে হবে।

ঘ) স্বার্থের সংঘাত এড়ানো অসম্ভব হয়ে পড়লে তার ধরণ সম্পর্কে জানাতে হবে।

ঙ) ক্ষমাতাধরদের মুখোমুখি হওয়ার ক্ষেত্রে সাহসী ও অক্লান্ত হতে হবে।

চ) বিজ্ঞাপন দাতাদের বিশেষ সুবিধা দেওয়া যাবেনা বা সংবাদকে প্রভাবিত করার সুযোগ দেওয়া যাবে না।

ছ) টাকা বা সুবিধার বিনিময়ে তথ্য দাতার ক্ষেত্রে সাবধান হতে হবে। সংবাদ সংগ্রহের জন্য দর কষাকষি করা যাবে না।

৪। দায়বদ্ধতাঃ একজন সাংবাদিক পাঠকের প্রতি, শ্রোতার প্রতি, দর্শকের প্রতি ও সহকর্মীর প্রতি দায়বদ্ধ।

ক) পরিবেশিত সংবাদ পর্যাপ্ত ভাবে ব্যাখ্যা করতে হবে এবং জনসাধারনের মতামত আহবান করতে হবে।

খ) সংবাদ মাধ্যম ও সাংবাদিকতা সম্পর্কে জনগণকে মত প্রকাশে উৎসাহিত করতে হবে।

গ) ভুল স্বীকার করতে হবে ও তা দ্রুত সংশোধন করতে হবে।

ঘ) সাংবাদিক ও সংবাদ মাধ্যমের নীতিবিরোধী কার্যকলাপ উন্মোচন করতে হবে।

উ) সাংবাদিকতায় সর্বজন স্বীকৃত উচ্চ মান বজায় রাখতে হবে।

অনলাইন সাংবাদিকতার নীতিমালাঃ অনলাইনে সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে, উপরোক্ত নীতিমালাই প্রযোজ্য। সেই সাথে নিম্নোক্ত বিষয়ে বিশেষভাবে যতুবান হওয়া উচিৎ।

ক) অন্যের সংবাদ তথ্য, ছবি, গ্রাফিক্স, ভিডিও ইত্যাদি কাট-কপি-পেষ্ট বা অন্য কোন প্রক্রিয়ায় নকল করা যাবে না। প্রয়োজন পড়লে লিংক ব্যবহার করা যেতে পারে। যদি লিংক কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলার সম্ভাবনা থাকে, সে ক্ষেত্রে ওয়েব সাইটের নাম, স্থান, পাতা, লেখকের নাম এসব পরিষ্কার ভাবে উল্লেখ করে, সারাংশ ব্যবহার করা যেতে পারে।

খ) তথ্যের সত্যতা যাচাই এর পরেই তা প্রকাশ করতে হবে। আরেকটি ওয়েব সাইটে সংবাদটি আছে তার অর্থ এই নয় যে সংবাদটির সত্যতা শতভাগ নিশ্চিত। সত্যতা নিজে যাচাই করতে হবে। তথ্যের উৎস সম্পর্কে পরিষ্কার ভাবে জানাতে হবে।

গ) অর্থ বা উপটৌকনের বিনিময়ে সংবাদ পরিবেশন করা যাবে না।

ঘ) অনলাইন প্রকাশনায় বিজ্ঞাপন বা অন্য কোন সূত্রে অর্থ উপার্জিত হলে তা গোপণ করা যাবে না।

ঙ) সকল ক্ষেত্রে সততা ও স্বচ্ছতা বজায় রাখতে হবে।

আগেই উল্লেখ করেছি, জেলায় অনেক ধরনের সংবাদপত্র ও অন্যান্য সংবাদ মিডিয়া আত্মপ্রকাশ করছে। সেই সাথে দেশে এমনকি ইউনিয়ন লেভেলে বিকশিত হচ্ছে সাংবাদিকদের সংগঠনগুলি। অথচ প্রতিদিন অনলাইন পত্রিকাগুলো ঘেটে দেখি সেখানে পাঠকের উপস্থিতি তেমনটা নাই। পাশাপাশি যা গড়ে উঠলে ভাল হতো, তা হলো পাঠক চক্র বা পাঠক ফোরাম। একজন সচেতন নাগরিক  হিসাবে আমি মনে করি, জেলার আনাচে-কানাচে যদি পাঠকদের সংগঠন গড়ে ওঠে তা যেমন একদিকে সাংবাদিকতার ক্ষেত্রকে সমৃদ্ধ করবে তেমনি সুশীল সমাজ গড়ার জন্য হয়ে উঠবে শ্রেষ্ঠ সহায়ক।

মোঃ জাহিদুল ইসলাম

  • বিএসসি (ল্যাব মেডিসিন) ডিইউ, এমএস (মাইক্রোবায়োলজি) পিএইউবি, এমপিএইচ (অন স্টাডি) আরইউ
  • চীফ মার্কেটিং এক্সিকিউটিভ, ডি-স্ক্যান হাসপাতাল (প্রস্তাবিত), চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৬৩০০

About Tutul Rabiul

Check Also

আব্দুল জলিলের ৬ষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকী আজ

আব্দুল জলিলের ৬ষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকী আজ

সংবাদটি পড়া হয়েছে : 185 শিমুল এমপি ও জেসি এমপির গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন  নিজস্ব প্রতিনিধি …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!