Thursday , August 22 2019
Home / ফিচার / অটিজম শিশুদের অধিকার ও সায়মা ওয়াজেদ পুতুল
অটিজম শিশুদের অধিকার ও সায়মা ওয়াজেদ পুতুল
অটিজম শিশুদের অধিকার ও সায়মা ওয়াজেদ পুতুল

অটিজম শিশুদের অধিকার ও সায়মা ওয়াজেদ পুতুল

আজমাল হোসেন মামুন:

২ এপ্রিল ১২ তম ‘বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস’। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও ২০০৮ খ্রিস্টাব্দ থেকে প্রতিবছর ভাবগম্ভীর পরিবেশ ও যথাযথ মর্যাদায় দিবসটি পালিত হচ্ছে । এ বছর বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবসের প্রতিপাদ্য, ‘সহায়ক প্রযুক্তির ব্যবহার, অটিজম বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন ব্যক্তির অধিকার’।
দিবসটি উপলক্ষে ২ এপ্রিল সকালে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
অটিজম শিশুদের জন্য একটি মারাত্মক সমস্যা। অটিজম বিষয়ে আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষের ধারণা নেই বললেই চলে।
চিকিৎসা শাস্ত্র মতে, অটিজম একটি রোগ। তবে কোন মানসিক রোগ নয়। আর যেসব শিশুরা এ রোগে আক্রান্ত হয় তাদের বলা হয় অটিস্টিক। শিশু অবস্থায় এই রোগের লক্ষণ প্রকাশ পায়। সাধারণতঃ তিন বছর হওয়ার আগেই শিশুর অটিজম সম্বন্ধে লক্ষণ দেখা যায়।
‘প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন ২০১৩’ এ অটিজম সম্বন্ধে বলা হয়েছে, ‘যাহার মধ্যে এক বা একাধিক লক্ষণ পরিলক্ষিত হইবে, তাহারা অটিজম বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন ব্যক্তি বলিয়া বিবেচিত হইবেন, যথা- (ক) মৌখিক বা অমৌখিক যোগাযোগে সীমাবদ্ধতা (খ) সামাজিক ও পারস্পরিক আচার-আচরণ, ভাব বিনিময় ও কল্পনাযুক্ত কাজ-কর্মের সীমাবদ্ধতা (গ) একই ধরনের বা সীমাবদ্ধ কিছু কাজ বা আচরণের পুনরাবৃত্তি (ঘ) শ্রবণ, দর্শন, গন্ধ, স্বাদ, স্পর্শ, ব্যথা, ভারসাম্য ও চলনে অন্যদের তুলনায় বেশি বা কম সংবেদনশীলতা (ঙ) বুদ্ধি প্রতিবন্ধিতা বা অন্য কোন প্রতিবন্ধিতা বা খিচুনী (চ) এক বা একাধিক নির্দিষ্ট বিষয়ে অসাধারণ দক্ষতা এবং একই ব্যক্তির মধ্যে বিকাশের অসমতা (ছ) চোখে চোখ না রাখা বা কম রাখা (Eye Contact) (জ) অতিরিক্ত চঞ্চলতা বা উত্তেজনা অসংগতিপূর্ণ হাসি-কান্না (ঝ) অস্বাভাবিক শারীরিক অঙ্গভঙ্গি (ঞ) একই রুটিনে চলার প্রচন্ড প্রবণতা এবং (ট) সরকার কর্তৃক সময়ে সময়ে গেজেট নোটিফিকেশনের দ্বারা নির্ধারিত অন্য কোন বৈশিষ্ট্য।’
এদের সঠিক পরিসংখ্যান না থাকলেও বাংলাদেশেও বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় অটিস্টিক শিশু ও কিশোরদের সংখ্যা বৃদ্ধির হার ভয়াবহ। জানা যায়, প্রতি ১ হাজার শিশুর মধ্যে একজন শিশু অটিস্টিক হয়ে জন্ম গ্রহণ করে বা অটিজমে আক্রান্ত হচ্ছে। ছেলেরা এই রোগে আক্রান্ত হয় বেশি। ছেলে মেয়ের আনুপাতিক হার ৪:১। আবার প্রতি ১০ জন অটিস্টিক শিশুর মধ্যে ২ জনের মধ্যে অত্যন্ত দক্ষতা দেখা যায় ছবি আঁকা, গান, নৃত্য অথবা কম্পিউটার বা গণিতসহ নানা ক্ষেত্রে।
আধুনিক যুগে সহায়ক প্রযুক্তির মাধ্যমে অটিস্টিক শিশুদের মূল স্রোতধারায় আনা সম্ভব।
বাংলাদেশে ‘লুক অ্যাট মি’ প্রযুক্তি ব্যবহার করে অটিস্টিক শিশুদের সহযোগিতার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।অটিস্টিক শিশুদের জন্য এটাই প্রথম অ্যাপ। বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে এই অ্যাপের কারিকুলাম বা কার্যক্রম তৈরি করেছে স্যামসাং রিসার্চ ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ। ‘লুক অ্যাট মি’র আন্তর্জাতিক সংস্করণ ইংরেজিতে, যা গুগল প্লে-স্টোর থেকে বিনামূল্যে ডাউনলোড করা যাচ্ছে অতি সহজেই। এ অ্যাপের বাংলা সংস্করণ ‘আমার দিকে তাকাও’ গুগল প্লে-স্টোরে পাওয়া যাবে। এছাড়াও ‘স্পিকস ফর মি’ নামে এ সফটওয়্যার তৈরি করেছেন অটিজমে আক্রান্ত এক শিশুর বাবা স্টিফেন লজ। ব্রিটিশ নাগরিক স্টিফেন লজ তার ১১ বছর বয়সী ছেলে যাতে অন্যের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে সে জন্য এ সফটওয়্যার তৈরি করেছেন। স্টিফেন লজ এখন সফটওয়্যারটি ব্যবহার করছেন একটি বহনযোগ্য স্পর্শকাতর পর্দার (টাচস্ক্রিন) মিডিয়া প্লেয়ারে সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের বার্মিংহামে এক প্রযুক্তি মেলায় এ যন্ত্র ব্যবহার করে স্টিফেন লজের ছেলে কুলাম অন্যের সঙ্গে কথা বলেছে। উইন্ডোজ এক্সপি, ভিসতা ও উইন্ডোজ ৭ অপারেটিং সিস্টেম চলে এমন যে কোনো যন্ত্রে স্টিফেন লজের সফটওয়্যার কাজ করবে।
যা অটিজম ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক বলা যেতে পারে।
অটিজমদের উন্নয়নে সবচেয়ে যার অবদান বেশি তিনি হচ্ছেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাতনি ও দেশরত্ন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল।
২০১১ খ্রিস্টাব্দের ২৫ জুলাই সায়মা ওয়াজেদ (পুতুল) এর পরামর্শক্রমে এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে ’Autism Spectrum disorders and developmental disabilities in Bangladesh and South Asian’ এর আন্তর্জাতিক সম্মেলনে ১১টি দেশের অংশগ্রহণে ‘ঢাকা ঘোষণা’ গৃহীত হয়, যা অটিজম শিশুদের উন্নয়নে এক মাইলফলক হিসেবে ধরা হয়। শুধু তাই নয়, উক্ত অনুষ্ঠানে আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, ভারতের কংগ্রেস নেত্রী শ্রীমতি সোনিয়া গান্ধিসহ বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান এবং ফাস্টলেডি উপস্থিত ছিলেন। তখন থেকেই অটিজম বিষয়ে বাংলাদেশে সবার মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি হয় অতিদ্রুত।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সায়মা ওয়াজেদ (পুতুল) এর আন্তরিকতার কারণে অটিজম বিষয়ে সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার উদ্যোগে উন্নয়নমূলক কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। এমনকি কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক ‘এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ড’ লাভ করেছেন বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের নিউরো ডেভেলপমেন্ট ডিজঅর্ডারস অ্যান্ড অটিজম সংক্রান্ত জাতীয় উপদেষ্টা কমিটির সভাপতি সায়মা ওয়াজেদ (পুতুল)। বর্তমানে অটিজম বিষয়ে গবেষণা, সচেতনতা ও কাজের পরিধি বৃদ্ধি পাচ্ছে।
শিশু মনোবিজ্ঞানী সায়মা ওয়াজেদ (পুতুল) এর প্রচেষ্টায় ২০১১ খ্রিস্টাব্দে ২৫ জুলাই গঠিত হয় ‘South Asian Autism Network (SAAN)’. যার মাধ্যমে সবাই সক্রিয় হয় অটিস্টিক শিশুদের উন্নয়নে কাজ করার জন্য। ২০১৩ খ্রিস্টাব্দে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের রাজধানীতে ১ম সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে কয়েকটি দেশের প্রতিনিধিরা অংশ গ্রহণ করে বাংলাদেশে প্রথম সদর দফতর প্রতিষ্ঠা করে।
অটিস্টিক শিশুদের জন্য সরকারের সুযোগ- সুবিধা যথেষ্ট রয়েছে। অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন শিশু ও ব্যক্তিদের বিনামূল্যে সেবা প্রদানের উদ্দেশ্যে ঢাকার মিরপুরে জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশন ক্যাম্পাসে অটিজম রিসোর্স সেন্টার ও একটি ‘স্পেশাল স্কুল ফর চিলড্রেন ও উইথ অটিজম’ স্থাপন করা হয়েছে। এখানে প্রায় ৮২ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রতিবন্ধী উন্নয়ন কমপ্লেক্স নির্মিত হচ্ছে। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে অটিজমসহ অন্যান্য প্রতিবন্ধিতায় আক্রান্ত শিশু শনাক্তকরণসহ বিনামূল্যে সেবা প্রদানের লক্ষ্যে ৩২টি মোবাইল থেরাপি ভ্যান চালু রয়েছে।
কয়েক বছর আগেও বাংলাদেশে অটিজম সম্পর্কে মানুষের তেমন কোন ধারণা ছিল না। আমার কন্যা সায়মা ওয়াজেদ-এর নিরলস প্রচেষ্টায় জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে অটিজমের গুরুত্ব ও সচেতনতা বৃদ্ধি পেয়েছে। তিনি এখন বাংলাদেশে অটিজম বিষয়ক জাতীয় উপদেষ্টা কমিটির চেয়ারপারসন। তাঁর উদ্যোগে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ‘অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন শিশু ও তাদের পরিবারের জন্য স্বাস্থ্যসেবা এবং আর্থ-সামাজিক সহায়তা বৃদ্ধি’ শীর্ষক প্রস্তাব গৃহীত হয়।
বর্তমান আওয়ামীলীগ ২০০৯ সালে সরকার গঠনের পর সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের পরামর্শে অটিজম বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টি ও তাদের কল্যাণে ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করে বাস্তবায়ন শুরু করে।
সেজন্য অটিজম ব্যক্তিদের স্বার্থ রক্ষার জন্য ‘নিউরো-ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী সুরক্ষা ট্রাস্ট আইন, ২০১৩’ পাশ করে এবং এই আইনের বিধিমালাও প্রণয়ন করে।যা অটিস্টিক শিশুদের জন্য আশির্বাদ স্বরূপ।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক অ্যাডভাইজরি প্যানেলের বিশেষজ্ঞ, বাংলাদেশের অটিজম বিষয়ক জাতীয় উপদেষ্টা কমিটির সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কন্যা সায়মা ওয়াজেদ হোসেন পুতুল অটিজম আক্রান্ত ব্যক্তিদের কল্যাণে নিরবচ্ছিন্ন ও উদ্ভাবনীমূলক কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ ‘ইন্টারন্যাশনাল চ্যাম্পিয়ন অ্যাওয়ার্ড’ পেয়েছে।
বাংলাদেশে অটিজম বিষয়টি সামনের সারিতে নিয়ে আসার ক্ষেত্রে অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক কার্যালয় ২০১৪ খ্রিস্টাব্দে সায়মা ওয়াজেদ পুতুলকে “এক্সিলেন্স ইন পাবলিক হেলথ্ অ্যাওয়ার্ডে” ভূষিত করে।
পরিশেষে, আমরা বলতে পারি অটিজম বিষয়ে সচেতনতা ও তাদের অধিকার আদায়ের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি অবদান সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের। এ মহিয়সি নারীর অবদান বিশ্বের বিবেকবান মানুষ অকপটেই স্বীকার করতে বাধ্য এ কথা বললে বাড়িয়ে বলা হবে না। আশা করি তিনি তাঁর জীবনকে অটিজমসহ সকল ধরনের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের উন্নয়ন ও কল্যাণে ব্যয় করবেন।এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

লেখক-
শিক্ষক ও কলাম লেখক।

About Tutul Rabiul

Check Also

আব্দুল জলিলের ৬ষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকী আজ

আব্দুল জলিলের ৬ষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকী আজ

সংবাদটি পড়া হয়েছে : 185 শিমুল এমপি ও জেসি এমপির গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন  নিজস্ব প্রতিনিধি …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!