Saturday , January 19 2019
Breaking News
Home / ফিচার / পলিটিক্যাল ব্র্যান্ডিং
পলিটিকাল ব্র্যান্ডিং
পলিটিকাল ব্র্যান্ডিং

পলিটিক্যাল ব্র্যান্ডিং

এম.জে. ইসলাম, সিএমই, ডি-স্ক্যান, চাঁপাইনবাবগঞ্জঃ

গত ৩০ ডিসেম্বর ২০১৮ তে বাংলাদেশের একাদশতম জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়ে গেলো। বিভিন্ন প্রার্থীর প্রচারণা নিবিড়ভাবে পর্বেক্ষন করে মনে হলো- আরে… ব্র্যান্ডিং-এর সুযোগ তো এখানেই! বিজনেস ব্র্যান্ডিং নিয়ে টুকটাক লেখালখির পুরোনো ঝোঁক তো ছিলোই তার উপর আগামীতে চাঁপাইনবাবগঞ্জে উপ-নির্বাচনের সম্ভাবনায় অনেক সাম্ভাব্য প্রার্থীর আগাম ফেসবুক প্রচারনা দেখে ভাবলাম পলিটিকাল ব্র্যান্ডিং নিয়ে লিখলে কেমন হয়?

১। প্রথমত Mass Marketing এর প্রবনতা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। ”আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা , সবার তরে আমি” এই থিওরি ২০১৮ সালে চলবেনা! একই মার্কেটিং টেকনিক সবার জন্য পজিটিভ ফলাফল দেয় না। তাই খুঁজে বেছে খুব ফোকাসড একটি জনসংখ্যা নিয়ে আলাদা আলাদা ক্যাম্পেইন ভাল ফলাফল পাওয়া যেতে পারে। মনে রাখতে হবে, আপনি আইসক্রিম বিক্রেতা না যে সবাইকে খুশি করতে পারবেন। তাই তরূণ হোক, চাকরীপ্রত্যাশী হোক কিংবা সিনিয়র সিটিজেন। ফোকাস করে ফেলুন কাদের নিয়ে কি কাজ করবেন।

২। এরপরই লাগবে একটি ফোকাসড মেনিফস্টো বা এজেন্ডা। এখানেও মাথায় রাখতে হবে দুনিয়ার সব প্রমিজ করতে যাবেন না! ওভারপ্রমিজ অলোয়েজ কিলস! ২-৩ টি মনে রাখার মতো প্রমিজ করুন আর সেটিই বার বার মনে করিয়ে দেন আপনার প্রচারনায়, তাতে আমজনতা মনে রাখবে আপনি কি ওয়াদা করছেন। দলীয় ইশতেহারে অনেক কিছু থাকতে পারে সেখান থেকেই আপনার নিজস্ব একটি ব্রান্ডিং এজেন্ডা ঠিক করে নিতে পারেন তবে সেক্ষেত্রেও আপনার নির্বাচনী এলাকার মানুষের ইচ্ছে কিংবা চাহিদার কথা মাথায় মাথায় রাখতে হবে। জনগন কিন্তু সবসময় মুখে বলেনা তারা কি চায়? তবে সেটা জানার দায়িত্ব আপনার। আর তাই এলাকার মানুষদের সরাসরি জিজ্ঞেস করা ছাড়াও কিছু  পারদর্শী “স্পেশাল এজেন্ট” নিয়োগ দিতে পারেন যারা কিনা এই তথ্য সংগ্রহে আপনাকে সহযোগিতা করবে। বানিজ্যিক প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে প্রি-ইলেকশন সার্ভে করার উদাহারণ উন্নত দেশগুলোতে ভুরি ভুরি দেখা যায়।

৩। ‘পাওয়ার অব ওয়ার্ড” আরেকটি বড় হাতিয়ার ব্র্যান্ডিং এর। একটি শব্দ খুঁজে বের করুন যা কিনা আপনার পুরো নির্বাচনী প্রচারনার সাথে ব্যবহার করা যাবে। ওবামা যেমন “হোপ” শব্দটি দিয়ে পুরা হিট! মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও তেমন “ডিজিটাল বাংলাদেশ” শব্দ দিয়ে গত নির্বাচন মাতিয়ে দিয়েছিলেন। স্ট্রং আর রেলিভেন্ট একটি শব্দ হতে পারে আপনার ব্র্যান্ডিং এর চমৎকার একটি হাতিয়ার।

৪। ‘টেইলরিং স্পিচ”! জী হ্যাঁ! বিশ্বাস করুন আমজনতা আর আমজনতা নেই! সবার হাতে মোবাইল। আপনি যখন নির্বাচনী প্রচারনা কিংবা জনসংযোগে যাবেন, বক্তিৃতা দিবেন তখন সামনের ফোন ক্যামেরা গুলো দেখলে বেশ ভালো লাগে? হুম! সেটাই আসলে ‘কাল” এক দিক দিয়ে। কারণ আপনার কথার রেকর্ড গুলো থেকে যাচ্ছে।

আজ এই এলাকায় বক্তব্য দিবেন আবার বিকেলে পাশের এলাকায় ঐ একই বক্তব্য দিয়ে পার পেয়ে যাওয়ার দিন যে শেষ! লোকজন জানবে আপনি এক কথাই রিপিট করছেন! কিছুটা শেয়ালের এক কুমির বার বার দেখানোর মতো আর কি! আপনার সাঙ্গপাঙ্গ হয়তো আপনাকে বলে বেড়াচ্ছে “জোশ হইছে বস! সেইদিন একদম নেই !” এদের কথা একটু কম বিশ্বাস করবেন! বক্তৃতা কাস্টমাইজ করুন এলাকা ভেদে। এতটুকু এফোর্ট তো দেয়াই যায় নাকি? জাতীয় নির্বাচন বলে কথা! আর হ্যাঁ! দুই থেকে তিন জন সমালোচক রাখুন দলে। কি ভালো বলেননি কিংবা কি বলতে পারতেন তারাই বলুক!

৫। নির্বাচনী প্রচারণার ক্ষেত্রে ইসি কমিটির অনেক শর্ত আছে। তা মেনে চলেও কিছু আউট অব দ্য বক্স ব্র্যান্ডিং করা সম্ভব! ৫ বছর পর পর আসে এই নির্বাচন! একটু উৎসবমুখর হলে দোষ কি? এলাকাভিত্তিক বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের ব্যবহার কিন্তু নির্বাচনী প্রচারণার মাত্রাকে দিতে পারে একটু অন্যরকম রূপ। গম্ভীরা কিংবা আলকাপ গানও কিন্তু চমৎকার মাধ্যম হতে পারে! আয়োজন করা যেতে পারে পথনাটক কিংবা সাংস্কৃতিক অন্যান্য কার্যক্রম।

৬। আরেকটি বিষয়, যারা এখন দায়িত্বে আছেন তাদের নির্বাচনী প্রচারণা আর যারা নতুন মনোনয়ন পেয়েছেন কিংবা এলাকা থেকে এইবারই প্রথম দাঁড়াবেন তাদের প্রচারণা কিন্তু ভিন্ন হতে হবে। সব এক কাতারে ফেলে দিলে হবে না। যারা বর্তমান এমপি তাদের প্রচারণায় থাকতে পারে নতুন কি পরিকল্পনা আছে আর বর্তমান কোন কাজটি আপনার কারণে হয়েছে। এদিকে নতুন করে মনোনয়ন পাওয়াদের কিন্তু স্পষ্ট করে তাকে ভোট দেয়ার কারণ গুছিয়ে বলতে হবে!

৭। ডিজিটাল মাধ্যমের কথা কিন্তু ভুলে যাওয়া চলবে না। নির্বাচনী প্রচারনায় প্রযুক্তির ব্যবহার নতুন কিছু নয় বরং বেশ পুরোনো এবং আমেরিকান প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারনায় ওবামা ব্ল্যাকবেরী মোবাইল এর কিছু ফিচার ব্যবহার করেছিলেন। এখন বক্তব্যের অডিও ক্লিপ সোশ্যাল মিডিয়া, টেক্সট মেসেজ কিংবা ভয়েস মেসেজ ব্রডকাস্টিং এর মাধ্যমে অল্প সময়ের মধ্যে টার্গেটেড এলাকায় ছড়িয়ে দেয়া এখন বেশ সহজ। তাছাড়া ওয়াইফাই দিয়েও সফলভাবে ইলেকশন প্রোমোশন করার নজির আছে। আর এই ডিজিটাল ব্র্যান্ডিং-এর কাজগুলো প্রফেশনাল কাউকে দিয়ে করালে ভালো। সবাই তো সব কিছু পারে না! তাই না? কাঁচা হাতে কি লিখতে কি লিখে ফেলেন। পরে পড়বেন বিপদে! দরকার কি?

৮। বেশি লিখে ফেলছি? ওকে শেষ কথা। যেহেতু ইভেন্টের কথা বলেছি তাই এটা মাথায় রাখতে হবে, জনসংযোগ হোক কিংবা প্রচারণার উদ্দ্যেশে যে কোন কার্যক্রম, ইভেন্ট হতে হবে খুব গোছালো। এই নাই সেই নাই। বসার জায়গা নাই। হঠাত বৃষ্টি আসলে মাথা গোঁজার ঠাই নাই এরকম ইভেন্ট করার চেয়ে বাসায় বসে টিভিতে, ফেসবুকে অন্যদের প্রচারণা দেখা বহুত ভালো!

আপনার ইভেন্ট হতে হবে আপনার রিফ্লেকশন। অর্গানাইজড। এতে জনমনে আপনার লিডারশিপ স্কিল ছাড়াও অর্গানাইজিং পাওয়ারও প্রকাশ পাবে! সবশেষে নিজে জিতে গেলে প্রতিপক্ষকে ধন্যবাদ দিন আর হেরে গেলে জানান অভিনন্দন!

বলে রাখা ভালো, আমি নিজে রাজনীতির সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত কেউ না। পলিটিক্সকে কিভাবে আরও ব্র্যান্ডিং করা যায় তা নিয়ে আমার ভাবনায় এই বিশ্লেষণ টাইপের লেখা, তারমানে আমার এই লেখার পুরোটাই ”আমি যদি” টাইপের। এখানে কোন কোন আইডিয়া আমি নিজে থেকে ভাবলেও অনেক আইডিয়া হয়তো এরই মধ্যে কেউ না কেউ বাস্তবে দেখিয়ে ফেলেছে সুতরাং এই লেখাটা নতুন করে চাকা আবিষ্কারের মত।

About Tutul Rabiul

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!