Breaking News
Home / মতামত / চলছে “ইসলাম বিরোধী ব্র্যান্ডিং”
চলছে “ইসলাম বিরোধী ব্র্যান্ডিং”
চলছে “ইসলাম বিরোধী ব্র্যান্ডিং”

চলছে “ইসলাম বিরোধী ব্র্যান্ডিং”

”ধর্মের বেশে মোহ যারে এসে ধরে, অন্ধ সে জন মারে শুধু আর মরে”

সেই সময়ের রবীন্দ্রনাথও, আজকের বাংলাদেশে এতখানি প্রাসঙ্গিক! অথচ আমদের ভাবনা রবীন্দ্রনাথকে ছুঁতে পারেনি। কারণ আমরা চিন্তাশীল নই। চিন্তা ভাবনার সবটুকু ব্যক্তিগত, এককেন্দ্রিক, একপেশে, একমুখী। চিন্তার মধ্যে কোনো সৃজনশীলতা, সার্বজনীনতা নেই। তাই প্রতিক্রিয়াশীলরা আমাদের ওপর চেপে বসতে পারেছে।

”জঙ্গীবাদ” বিষয়টা আমাদের দেশে নতুন নয়। হঠাৎ করে এমন পরিস্থিতি জন্ম নেয়নি। অথচ দীর্ঘদিন ধরেই আমাদের দেশে জঙ্গিবাদের বিষয়টা সরলীকরণের চেষ্ট হচ্ছে। এরই সুযোগে জঙ্গীবাদের জাল তৃনমূল পর্যন্ত বিস্তৃত হচ্ছে। জঙ্গীবাদের মত জাতীয় ইস্যুকে রাজনীতিকরনের ফলে এটাকে এখন রাতারাতি নির্মূল করা অসম্ভব ।

দেশে দু-চারশ জঙ্গী থাকলে  তাদেরকে হয়ত ধরে ফেলা সম্ভব কিন্তু দীর্ঘ সুযোগে যে লাখো-কোটি আদর্শিক জঙ্গী দেশে তৈরি হয়েছে তাদেরকে ধরবে কে? তাদের চিন্তা-চেতনা-বিশ্বাসের আমূল পরিবর্তন না করতে পারলে জঙ্গি উৎপাদনের কারখানা চিরতরে সিলগালা করা সম্ভব নয়। বিষয়টার বিস্তৃতি নিয়ে ভাবনার সময় এসেছে। মাম্মি-ড্যাডি ডাকা সন্তানরা এখনকার জঙ্গি সন্ত্রাসে যুক্ত। তাই কিউর (রোগ হওয়ার পর তার চিকিৎসা) এবং প্রিভেনশন (রোগ হওয়ার আগেই তার প্রতিরোধ) একসঙ্গে দুটোরই দরকার। জঙ্গিবাদ নিয়ে পরিবার থেকে রাষ্ট্র সবার ব্যস্ততায় কিউর এর কার্যক্রম পড়লেও প্রিভেনশন কার্যক্রম তেমনটা চোখে পড়ে না।

সর্বত্রই শোনা যাচ্ছে মগজ ধোলাইয়ের কথা! কিন্তু আমাদের মনে রাখা দরকার মগজ ধোলাই অন্য যে কোন ধোলাই হতে একটু আলাদা। সেই মগজই ধোলাই করা সম্ভব, যেটা পরিস্কার। মগজে কিছু থাকলে সেটা ধোলাই করা সম্ভব না। সেদিকটায় অভিভাবকদের নজর থাকা প্রয়োজন। নামী-দামী স্কুল, ভালো কলেজ আর এ-প্লাস রেজাল্ট নিয়ে মাতম করার পাশাপাশি মানবিক মূল্যবোধের শিক্ষা সন্তান পাচ্ছে কি? যারা জঙ্গিবাদে জড়াচ্ছে তারা হয়তো উচ্চশিক্ষিত কিংবা বনেদি পরিবারের কিন্তু বাংলাদেশের সংস্কৃতির শেকড়ের সাথে তাদের কোনো সম্পর্ক নাই।

এবারের প্রসঙ্গটা একটু ভিন্ন। একটা গোষ্ঠি তৈরি হয়েছে, যারা এই অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে খুব সুক্ষ্ণভাবে ইসলাম ধর্মের ‘নেগেটিভ ব্র্যান্ডিং’ চালায়। ধর্মহীন সমাজের স্বপ্ন দেখে। বাছবিচার ছাড়াই ধর্মের ব্যাপারে ‘নেতিবাচক’ মন্তব্য করে। ধর্মপ্রাণ মানুষ নিয়ে হাসি-ঠাট্টা করাটাকে স্মার্টনেস ভাবে। আর কিছুই নয়, সাধু সাবধান! জঙ্গীবাদ এভাবে আরো ফেনায়িত হয়ে উঠবে।

হলি আর্টিজানে হামলাকারীরা ছিল ইউনিভার্সিটি থেকে উচ্চ শিক্ষিত, তাদের মুখে দাড়িও ছিল না। কিন্তু হলি আর্টিজানের উপর ফিল্ম তৈরি করতে যেয়ে অভিনেতা জাহিদ হাসানের কপালে সিজদার দাগ, মুখে দাড়ি ঝুলিয়ে দেয়া হলো কেন? তিশার সাথে হিজাবটার কি সম্পর্ক? ফিল্মের মেসেজটা পজিটিভ-নেগেটিভ যাই হোকনা কেন এমন বিতর্কিত রুচির পোষ্টার ভাবনার বিষয়!

ধর্মহীন সমাজের কল্পনাকারীগণ বিভ্রান্ত কয়েকজন যুবকের জন্য ঢালাওভাবে ধর্মকে আঘাত করছেন? হ্যাঁ, আপনাকেই বলছি, এই দুঃসহ জুলুম ও বে-ইনসাফির যুগে আপনি ধর্মকে ছুঁড়ে ফেলে দিতে চাইলেও ধর্ম আপনাকে ছাড়বে না। অথবা আপনার উত্তরাধিকারকে ছাড়বে না। হয়তো পক্ষ হয়ে, অথবা বিপক্ষ হয়ে, কোনো না কোনো সময় আপনি ধর্মের কাছে হাজিরা দিতে বাধ্য হতে পারেন, অথবা আপনার সন্তান বাধ্য হবেন।

তাই আগে থেকে জেনে নেয়া ভালো, কোনটি ধর্ম আর কোনটি অধর্ম। সন্তানকে জানিয়ে রাখুন। পরিবারকে জানিয়ে রাখুন। জীবনের ঘূর্ণিপাকে ধর্মের সাথে মোলাকাত হয়ে গেলে যাতে চিনতে অসুবিধা না হয়, বিভ্রান্ত না হতে হয়। না চেনা, না জানা অবস্থায় হঠাৎ ‘ধর্ম’ পরিচয়ে কিছু একটার সাথে সাক্ষাৎ হয়ে গেলে সে আপনাকে বা আপনার সন্তানকে বিভ্রান্ত করে ‘গুলশান’ কিংবা ‘কল্যাণপুরে’ নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করবেই!

শঙ্কার বিষয় হলো, এই মুহুর্তে স্কুল-কলেজ-ভার্সিটির কোনো ছেলে হঠাৎ করেই নামাজ-রোজা শুরু করলে তার পরিবার নিশ্চয়ই চিন্তায় পড়ে যাবে! হঠাৎ কোরআন পড়া শুরু করলে হয়তো হাতে টাকা দিয়ে বলবে, যাও সিনেমা দেখে আসো। তাবলিগে যেতে চাইলে কক্সবাজারের টিকেট দিয়ে বলবে, ঘুরে আসো। যেভাবেই হোক, পরিস্থিতিটা এমন দাঁড়িয়েছে যে, আমরা এখন আর আমাদের নিজের সন্তানকেও বিশ্বাস করতে পারছি না!

চারিদিকে দলা পাকানো অবিশ্বাস, অস্থিরতা আর আতঙ্ক। দুর্ভাগ্য, আমরা নিজ হাতেই এই পরিস্থিতি তৈরি করেছি। একবার ভাবুন, ঢাকা শহরের কোনো জ্যামে দাঁড়িয়ে কোনো যুবক যদি ‘আল্লাহু আকবর’ বলে চিৎকার করে ওঠে…। বোধকরি, আতঙ্কে জ্যাম ভেঙ্গে যাবে। ট্রাফিক পুলিশ যুবককে আটক করবে। সংবাদ হবে, কান থেকে কানে উঠবে, সমান্তরালে আতঙ্ক বাড়বে। এইতো কয়েকদিন আগে সাঁজোয়া যান ও ফায়ার ব্রিগেডের গাড়ি নিয়ে গুলশানের এক ভবন প্রায় তিন ঘণ্টা ঘেরাও করে রাখলো আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী, পরে জানা গেল কয়েকটা ছিঁচকে চোর ঐ ভবনে ঢুকে পড়েছে!

‘আল্লাহু আকবার’ এটা ভয়ের কোনও শব্দ তো না! এই শব্দ আমরা দিনে ৫টা সময়ে আজানের মধ্যে শুনি। রোজায় ইফতারি করি, ‘আল্লাহু আকবার’ শুনেই। আমার আপনার জন্মের পর কানের কাছে চিৎকার করে বলা হয়েছে ‘আল্লাহু আকবার’। সে হিসেবে এটা পৃথিবীতে আমাদের প্রথম শোনা শব্দ, সবচেয়ে বেশিবার শোনা শব্দ। মসজিদের নগরিতে চারপাশ থেকে অসংখ্যবার ভেসে আসে এই শব্দ। কোনদিন তো কেঁপে উঠিনি শব্দটা শুনে!

জঙ্গিরা ‘আল্লাহু আকবার’ বলে একেকটা হামলা করে আমাদের এসবই উপহার দিয়ে যাচ্ছে! এখানে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হল, আমরা কি ‘আল্লাহু আকবর’কে বাতিল করে দিবো, ঘৃণা করবো নাকি গ্রহণ করে বলবো, এটা জঙ্গিদের পৈত্রিক সম্পত্তি নয়। আমরা যদি ‘আল্লাহু আকবর’কে বাতিল করে দেই তাহলে জয়টা কিন্তু জঙ্গিদেরই হল। তারা আসলে এটাই চায়। আর যদি আল্লাহু আকবর জঙ্গিদের শ্লোগান নয় বলে প্রতিরোধ গড়তে পারি তাহলে জয়টা হবে আমাদের। সিদ্ধান্ত নিতে হবে, আমরা কোনটা করবো।

শুধু আল্লাহু আকবর নয়, একইভাবে ‘জয় বাংলা’ শ্লোগানের মালিকানাও প্রায় আমজনতার যেন আর থাকছে না। একাত্তরে এই একটা শ্লোগান ছিল আবালবৃদ্ধবণিতা সবার মুখে মুখে। জয় বাংলা শ্লোগানকে ভুলে যাওয়া একাত্তরে চেতনা থেকে সরে আসার নামান্তর। জয় বাংলা বাঙালির শ্লোগান, এই শ্লোগানকে অবজ্ঞা করলে নিজেদের অস্তিত্বে টান পড়ে।

অনেকেই ভাবে, জয় বাংলা হল, একটি দলের শ্লোগান! এই সর্বৈব মিথ্যাটি ইতোমধ্যে বেশ বাজার পেয়েছে। অথচ ‘জয় বাংলা’ বাঙালির প্রাণের শ্লোগান। ঐ ‘আল্লাহু আকবর’ এর মতো আমরা এর অধিকার ছেড়ে দিয়েছি বলেই সুযোগসন্ধানীরা এর মালিকানা নিয়েছে, অপব্যবহার করছে। জয় বাংলা শ্লোগানে আমরা অস্ত্রের ঝনঝনানি শুনেছি, অস্ত্রের ব্যবহারও দেখেছি। এমনকি যে জাতীয় পার্টির শ্লোগান জামায়াত-বিএনপি’র মতো ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’, সেই জাতীয় পার্টির একজন সংসদসদস্যও শিক্ষককে অপমান করার সময় ‘জয় বাংলা’ শ্লোগানকেই যুৎসই মনে করেছে! যদিও অপরাধ করার জন্য এই শ্লোগানকে ব্যবহার করলেও, তাতে শ্লোগান অপবিত্র হয়ে যায়নি।

জঙ্গিবাদ প্রতিরোধে এই শ্লোগানকেই উচ্চকিত করি। অপব্যবহারকারীদের মুখ থেকে শ্লোগান দুটি কেড়ে নিতে হবে। ঘৃণার চর্চাটা চিরতরে বন্ধ করে দেই। ধর্মকে আত্তীকরণ করি, সকল অপব্যাখার দাঁতভাঙ্গা জবাব দেই। যত কিছুই বলা হোক না কেন, ধর্মকে দূরে সরিয়ে রেখে জঙ্গিবাদের মোকাবেলা সম্ভব নয়।

এড়িয়ে যাওয়াটা সমাধান নয়। তরুণদেরকে সন্দেহ করে, ঘৃণা করে, দূরে সরিয়ে দিয়ে ভালো কিছু আশা করা সম্ভব নয়। বরং ভালোবেসে সন্তানের মাথায় হাত রেখে বলুন, তোমার অপার সম্ভাবনাময় মেধাকে কাজে লাগাও, দেশকে স্বয়ংসম্পূর্ণ কর; তোমাদের গায়ের জোরকে নয়, মেধাকে ব্যাবহার কর। বেদনাকে শক্তিতে পরিণত কর; নিজেদের রাগকে সংবরণ কর! এটাই হবে তোমার শ্রেষ্ঠ আত্মত্যাগ! এটাই তোমাদের যুদ্ধ! জীবন দিতে, জীবন নিতে সবাই পারে; কিন্তু মানবতার শিক্ষায় আলোকিত জীবন সবাই গড়তে পারে না। এর জন্য শক্তি লাগে, সাহস লাগে, আদর্শ লাগে, যা তোমাদের আছে। উঠে দাঁড়াও।

সর্বাগ্রে প্রয়োজন তরুণদেরকে পারস্পরিক কল্যাণ-সহযোগিতা-সহমর্মিতায় উদ্বুদ্ধ ও নিবেদিত করা; দেশপ্রেম ও মানবপ্রেমের কল্যাণকর্মে আন্দোলিত করা। সেক্ষেত্রে পারিবারিক ভালোবাসায় শুরু থেকেই শিশুর মনন ও চিন্তাকে সুউন্নত করতে হবে। সকল কুকর্ম ও কুচিন্তা দূর করতে হলে তরুণদের মাঝে ভালো কথা-চিন্তা-কর্মের সন্নিবেশ ঘটাতে হবে। তাহলেই কেবল এসব সামাজিক ব্যাধি দূর করা সম্ভব।

আমাদেরকে ঘৃণার চর্চা বন্ধ করতে হবে। কাউকে চট করে ‘বাতিল করে দেয়া’র প্রবণতা বন্ধ করা জরুরী। অমুক নাস্তিক (যদিও সেটা নিশ্চিত বা প্রমাণিতও নয়) সুতরাং সে আমাদের গোষ্ঠির নয় জঙ্গীদের প্রথম দীক্ষা এটাই। তাই আগেভাগেই মানুষকে আলাদা করে ফেলার এই প্রবণতা থেকে তরুণদের বের করে আনা ভীষণ জরুরী।

মানুষ হয়ে ওঠার আগেই মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান কিংবা ইহুদী হয়ে যাওয়াটা সমস্যা। তাই কিছু তরুণের জন্য মানুষ হবার চেয়ে আইএস হওয়া সহজ হয়ে ওঠে! এমতাবস্থায় কেউ যখন বলে, ‘বিধর্মী মারো, জান্নাতে দাখিল হও’ তখন সেই তরুণ বিচারিক বোধ হারিয়ে ফেলে। আগে থেকেই ভেতরে মানুষের জন্য ভালোবাসা জমা না থাকায় চাইলেই তাকে উস্কে দেয়া যাচ্ছে।

মোদ্দাকথা, ধর্মের ভেতরে থেকেই ধর্মের মহত্বকে বর্ণনা করতে হবে। একইভাবে তরুণদেরকে ঘৃণা করে কিংবা তাদের ওপর আস্থা হারিয়ে ভালো ফল আশা করাটা বোকামী। ভালোবাসার জয় আর ঘৃণার বিনাশ হোক। আমাদের অশ্রুই আমাদের দৃষ্টিকে পরিষ্কার করুক। অহিংসা হোক আত্মার আর্তি।

এম.জে. ইসলাম, সিএমই, ডি-স্ক্যান, চাঁপাইনবাবগঞ্জ

About Tutul Rabiul

Check Also

নাগরিক সাংবাদিকতা

জনপ্রিয় হয়ে ওঠেছে নাগরিক সাংবাদিকতা

সংবাদটি পড়া হয়েছে : 286 আজমাল হোসেন মামুন: আমাদের দেশে অনলাইন পত্রিকার সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!