Wednesday , November 21 2018
Breaking News
Home / ফিচার / ভবিষ্যত আতংক টাওয়ার রেডিয়েশন
ভবিষ্যত আতংক টাওয়ার রেডিয়েশন
ভবিষ্যত আতংক টাওয়ার রেডিয়েশন

ভবিষ্যত আতংক টাওয়ার রেডিয়েশন

মোবাইল টাওয়ার রেডিয়েশন এক নীরব ঘাতকের নাম। বিজ্ঞানীরা বলছেন- এটি বৈশ্বিক উষ্ণায়নের চেয়েও বেশী ভয়াবহ এবং তীব্র। এই রেডিয়েশন কৃষি বাস্তুতন্ত্র তথা উদ্ভিদ ও প্রাণীকূলের জন্য হুমকিস্বরূপ। মোবাইল টাওয়ারের রেডিয়েশনের উপর সারাবিশ্বে এ পর্যন্ত ৯১৯ টি গবেষণা কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে যাতে ৫৯৩ টি গবেষণায় পশু, পাখি, পোকামাকড়, অণুজীব এবং মানুষের উপর নেতিবাচক প্রভাব প্রমাণিত হয়েছে। মোবাইল টাওয়ার থেকে নির্গত ইলেক্ট্রো ম্যাগনেটিক রেডিয়েশন (ইএমআর) ঘটিত ইলেক্ট্রো স্মোগ এতই মারাত্বক যে এটি পশু, পাখি, পোকামাকড় এমনকি মানুষের বায়োলজিক্যাল সিস্টেমকে নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্থ করছে। আলবার্ট আইনস্টাইন বলেছেন- মৌমাছির দিকে লক্ষ্য করো। যখন মৌমাছি ধ্বংস হয়ে যাবে তার চার বছরের মধ্যেই মানুষও নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। এ উক্তির অন্তর্নিহিত অর্থ অত্যন্ত সুদূর প্রসারী। বৈশ্বিক ফসল উৎপাদনে পরাগায়নকারী হিসেবে মৌমাছি যে ভূমিকা পালন করে তার মূল্য প্রায় ২০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের উপরে। সারাবিশ্বে প্রায় ৬০ শতাংশ উদ্ভিদের পরাগায়নই হয় প্রাণী পরাগায়ণকারীর মাধ্যমে আর মৌমাছি পৃথিবীর প্রায় ৯০ টিরও অধিক বাণিজ্যিক ফসলের পরাগায়নে মূখ্য ভূমিকা পালন করে।
যুক্তরাষ্ট্রে এক গবেষণায় দেখা গেছে যে- গত কয়েক বছরে মৌমাছি সংখ্যা প্রতিনিয়ত মারাত্বক হারে কমে যাচ্ছে। যার কারণ হিসেবে তড়িৎ চুম্বকীয় রেডিয়েশন (ইএমআর) বৃদ্ধি জনিত দূষণকে দায়ী করা হয়েছে। যা মৌমাছির আন্তঃকোষীয় যোগাযোগকে ব্যাহত করে। এছাড়াও উচ্চমাত্রার তড়িৎ চুম্বকক্ষেত্র সম্পন্ন মোবাইল ফোন জীবিত প্রাণীর ব্রেইনের কিছু অংশে পরিবর্তিত রূপ দিতে পারে। যা মৌমাছিদের মৌচাকে ফিরে আসার ক্ষমতাকে বাধাগ্রস্থ করে। বেলজিয়ামের ব্রাসেলসের রিসার্চ ইন্সটিটিউট ফর ন্যাচার এন্ড ফরেষ্ট এর বিজ্ঞানীরা সমগ্র ইউরোপ এবং যুক্তরাষ্ট্রের মৌমাছির কলোনি ধ্বংসের কারণ হিসেবে ইএমআর কে চিহ্নিত করেছেন। সম্প্রতি এক সমীক্ষায় দেখা গেছে যে- ভারতের কেরালা রাজ্যে নতুন এই নীরব ঘাতকের (ইএমআর) প্রভাবে বাণিজ্যিকভাবে মৌমাছি থেকে মধু চাষ ব্যবসায় মারাত্মক ধ্বস নেমেছে এবং এই ব্যবসায় জড়িত ১-১.২৫ লক্ষ লোক মারাতœক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। ভারতের পাঞ্জাব ইউনিভার্সিটির গবেষকরা মৌচাকে প্রতিদিন ২-১৫ মিনিট মোবাইল রেডিয়েশন অব্যাহত রাখেন এবং ৩ মাস পরে দেখেন মৌচাকে মধু উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে, ডিম উৎপাদন অর্ধেকে পৌঁছেছে এবং মৌচাকের আকার কমেছে অনেকখানি। ইংল্যান্ডে বিগত বিশ বছরে মৌমাছির সংখ্যা শতকরা ৫৪ ভাগ কমেছে। যা পুরো ইউরোপের শতকরা ২০ ভাগ। সাম্প্রতিক তথ্যে দেখা গেছে- স্পেনে শতকরা ৮০ ভাগ মৌচাক ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে।

পিঁপড়ার উপর গবেষণায় দেখা গেছে ইএমআর-এ উন্মুক্ত পিপড়া তাদের ঘ্রাণশক্তি, দৃষ্টিশক্তি এবং স্মৃতিশক্তি কয়েক ঘন্টার মধ্যে হারিয়ে ফেলে (কেমার্ট, ২০১২)। আলফোসনো বালমোরি (২০০৫ সালে) প্রমাণ করেন- ইএমআর এর প্রভাবে চড়ুই, ঘুঘু, সারস, দোয়েল এবং অন্যান্য প্রজাতির পাখির বাসা এবং স্থান পরিত্যাগ, পাখা কমে যাওয়া এবং গমন ক্ষমতা কমে যায়। রাশিয়ায় এক গবেষণায় দেখা গেছে ডিম ফুটানোর সময়ে জিএসএম ফোনের কাছে উন্মুক্ত শতকরা ৭৫ ভাগ মুরগির ভ্রƒণ নষ্ট হয়ে যায় এবং মোবাইল টাওয়ারের পাশের পাখির বাসা থেকে এক সপ্তাহের মধ্যে পাখি বাসা ত্যাগ করে এবং ডিম থেকে বাচ্চা ফুটেনা। প্যারাগুপোলাস এবং মার্গারিটিস বিজ্ঞানীদ্বয় প্রমাণ করেন যে- ডিজিটাল জিএসএম ফোনের কাছে উন্মুক্ত ফ্রুুট ফাইয়ের প্রায় ৫০ ভাগ পর্যন্ত প্রজননের ক্ষমতা কমে যায়। পুরুষ ও মহিলা পোকা উভয়েকেই প্রতিদিন ৬ মিনিট করে রেডিয়েশনে উন্মুক্ত রাখলে ৪-৫ দিনেই যদি ৫০ ভাগ প্রজনন ক্ষমতা কমে যায়। তাহলে দীর্ঘ মেয়াদে তার কি ফলাফল হবে তা সহজেই অনুমেয়।

আলফোসনো বালমোরি- ২০০৬ সালে সর্বপ্রথম মাইক্রোওয়েভ রেডিয়েশনের প্রভাবে ব্যাঙের নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার যোগসূত্র একটি নিবন্ধে তুলে ধরেন। ইএমআর ব্যাঙাচির চলনে অক্ষমতা, অসমবৃদ্ধি এবং ঊচ্চ মৃত্যুহার (৯০%) ঘটাতে পারে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের মিডিয়াতে প্রকাশিত হয়েছে যে- ইএমআর এর প্রভাবে মাছ এবং বাঁদুর নাটকীয় ভাবে মারা যাচ্ছে। দুগ্ধবতী গাভীর দুধ উৎপাদন কমে যায়, স্বতঃস্ফূর্ত গর্ভপাতসহ প্রজনন স্বাস্থ্যের মারাতœক ব্যাঘাত ঘটে। মোবাইল টাওয়ারে পাশে অবস্থানকারী গাভীর শতকরা ৩২ ভাগ বাছুরই চোখের ছানি পড়া সমস্যায় ভোগে (হাসিগ, ২০১২)। ইএমআর উত্তাপ সৃষ্টির জন্য দায়ী। যার ফলে মাটিতে বসবাসকারী পোকামাকড় ও অণুজীব সমূহ মারা যায়। যা বাস্তুচক্রে বিপর্যয় বয়ে আনতে পারে। রেডিয়েশনের প্রভাবে ব্যাসিলাস সাবটিলিস, মাইকোব্যাকটেরিয়াম ধ্বংস হয়ে যায় (বরিক এবং ফগার্টি, ১৯৬৭)। ইএমআর এর প্রভাবে সুগার ফারমেন্টেশনের সময় ই. কোলাই এর বংশবৃদ্ধি ব্যাহত হয় বিশেষ করে জীবিত কোষের সংখ্যা কমে যায়। গাছপালা, ফসল, শাকসবজিতে তড়িৎ চুম্বকীয় রেডিয়েশনের নানা নেতিবাচক প্রভাব ইতোমধ্যেই প্রমাণিত হয়েছে। এক অনুসন্ধানে দেখা গেছে- মোবাইল ফোনের ইএমআর বীজের বৃদ্ধি, অঙ্কুরোদগম বাধাগ্রস্থ করা, মূলের বৃদ্ধি ব্যাহত সহ সার্বিক উৎপাদন ব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্থ করে। ইএমএফ লাইনের নিকটবর্তী জমিতে গম ও কর্ণের ফলন কমে যায়। লাটভিয়ার এক গবেষণা মোবাইল টাওয়ারের নিকটবর্তী পাইন গাছে রেজিন উৎপাদনের মাত্রা বেড়ে যাওয়া এবং বীজের অঙ্কুরোদগমের হার কমে যাওয়ার ইঙ্গিত দেয়। ড. উলফগ্যাগ ভল্করোৎ (সিমেন্সের পদার্থবিদ এবং প্রকৌশলী) জার্মানের বনাঞ্চল উজাড়ের কারণ নিয়ে গবেষণা করে প্রমাণ করেন এতে ইএমআর এর প্রভাব রয়েছে। রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি রেডিয়েশনে (৪০০-৯০০ মেগাহার্টজ)-এ ফঁপশবিবফ এর অক্সিডেটিভ স্ট্রেস সহ অন্যান্য অজানা স্ট্রেসের জন্য দায়ী (থালেক,২০০৭)। নিম্নমাত্রা রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি রেডিয়েশন টমেটো গাছের ক্ষতিকর উত্তেজক গ্রহণে ভূমিকা রাখে (রক্স, ২০০৭)। রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি রেডিয়েশনে চারা গাছের বৃদ্ধি, সুপ্ততা এবং কার্বন ডাই- অক্সাইড গ্রহণের সক্ষমতাকে ব্যাহত করে (হ্যাগার্টি,২০০৯)।

পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের পরিবেশ মন্ত্রণালয় প্রাণিকূল ও উদ্ভিদকূল রায় আইন প্রণয়নের জন্য কাজ করছে এবং সুপারিশ করেছে যে- বর্তমানে অবস্থিত টাওয়ারের ১ কিঃমিঃ এর মধ্যে নতুন কোন টাওয়ার নির্মাণ করা যাবে না। প্রতিটি টাওয়ার ৮০ ফুট উচ্চতায় কমপক্ষে ১৯৯ ফুট উঁচু হতে হবে। বাংলাদেশে ২০০৮ সালে বিটিআরসি মোবাইল টাওয়ারের রেডিয়েশনের ফলে উদ্ভিদে ক্ষতির মাত্রা কত তার জন্য একটি কমিটি হয়েছিল কিন্তু সে প্রতিবেদন আলোর মুখ দেখেনি। জিএসএম কমিউনিকেশন-এর একটি বিশেষজ্ঞ দল ২০১০ সালে একটি গবেষণা চালিয়েছিল। তারা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিল যে মোবাইল টাওয়ার রেডিয়েশন বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য এবং বাস্তসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে। সর্বশেষ ২০১২ সালে মহামান্য হাইকোট মোবাইল টাওয়ার রেডিয়েশনের মাত্রা কতটুক এবং জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশে এর প্রভাব জানতে নির্দেশ দেয়। গত কয়েক বছরে বাংলাদেশে বিভিন্ন মোবাইল অপারেটর কোম্পানির টাওয়ারের সংখ্যা অতিমাত্রায় বেড়েছে। মোবাইল অপারেটর কোম্পানিগুলো আন্তর্জাতিক বিধিমালার কোন তোয়াক্কা না করেই ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় এক টুকরো জমি লিজ নিয়ে কিংবা ছাদের উপর পরিবেশ ও জীব বৈচিত্রের জন্য হুমকি মোবাইল টাওয়ার স্থাপনের মত স্পর্শকাতর বিষয়টি চালিয়ে যাচ্ছে। উন্নত দেশে মোবাইল টাওয়ারগুলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল এবং আবাসিক এলাকা থেকে বহুদূরে অবস্থিত। বিশেষজ্ঞরা বলেন- আবাসিক ভবন থেকে সর্বনিম্ন ৩০০ মিটার দূরে মোবাইল টাওয়ার নির্মাণ করার কথা থাকলেও বাংলাদেশের আবাসিক ভবনের ছাদের উপরেই টাওয়ার নির্র্মাণ করা হচ্ছে। মোবাইল অপারেটর কোম্পানিগুলো দীর্ঘ মেয়াদে ইএমআর এর নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে একেবারেই উদাসহীন। এক জরিপে দেখা গেছে- মোবাইল টাওয়ারের ইএমআর এর প্রভাবে সেন্টমার্র্টিনে নারিকেল গাছে ডাব উৎপাদন কমে যাওয়া, ঝরে যাওয়া, অকারে ছোট হওয়া সহ অকালে অনেক গাছ মারা যাচ্ছে। বাংলাদশে মোবাইল ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ১১৬.২৩৯ মিলিয়ন (মে, ২০১৪; তথ্যসূত্রঃ বিটিআরসি) আর সারাদেশে মোবাইল ফোনের টাওয়ারের প্রকৃত সংখ্যা কত তার কোন তথ্য উপাত্ত কেউ জানে না। খোদ ঢাকা শহরে বিভিন্ন মোবাইল অপারেটর কোম্পানির টাওয়ারের সংখ্যা কত তার পরিসংখ্যান বিটিআরসি নিজেই জানে না।

মোবাইল টাওয়ারের রেডিয়েশনের নেতিবাচক প্রভাব থেকে বাংলাদেশের জনগণ কতটা নিরাপদ আর এদেশের কৃষি, জীব-বৈচিত্র্য কতটুকু ঝুঁকিপূর্ণ এ সম্পর্কীত কোন গবেষণা এদেশে অদ্যাবধি হয়নি। দুঃখের বিষয় হলো বিগত এক যুগ ধরে জনস্বাস্থ্য, কৃষি ও জীব-বৈচিত্রে মোবাইল টাওয়ারের রেডিয়েশনের নেতিবাচক প্রভাব গুরুত্বের সাথে বিবেচিতই হয়নি। কৃষিরা নির্ভর অর্থনীতির বাংলাদেশে মোবাইল টাওয়ার রেডিয়েশনের নেতিবাচক প্রভাব নিকট ভবিষ্যতে ফসল উৎপাদন, খাদ্য নিরাপত্তা সর্বোপুরি জীবন ও জীবিকায় ভয়াবহ বিপর্যয় বয়ে আনতে পারে। তাই এ বিষয়ে অনতিবিলম্বে সরকারের আশু পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।

About Tutul Rabiul

Check Also

হারিয়ে যাওয়া রিকশা চিত্রাংকন (রিকশা পেইন্ট)

হারিয়ে যাওয়া রিকশা চিত্রাংকন (রিকশা পেইন্ট)

সংবাদটি পড়া হয়েছে : 69 এম জে ইসলাম পুরো জেলা ছিলো আর্ট গ্যালারী! এক একটি …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!