Wednesday , November 21 2018
Breaking News
Home / সাহিত্য / ছোট গল্প: জীবনের বিষাদ গাঁথা
আজমাল হোসেন মামুন, সহকারী শিক্ষক, হরিমোহন সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়
আজমাল হোসেন মামুন, সহকারী শিক্ষক, হরিমোহন সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়

ছোট গল্প: জীবনের বিষাদ গাঁথা

আজমাল হোসেন মামুন:

সূর্যের তাপ কমে আসছে। সুর্যাস্ত হবে ঘণ্টাখানেক পরেই। নেমে আসবে সন্ধ্যা। অনেকে ফিরছে নিজের বাঁসায়। ঠিক এমন সময় হযরত শাহ জালাল (রহঃ) আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর সংলগ্ন হাজী ক্যাম্পের পূর্ব পার্শ্বে কলিমের সাক্ষাৎ নয়নের সাথে। কলিম পেশায় কবি। দুজনে চলে গেল কাঁচকুড়া কলিমের বাঁসা। পথিমধ্যে দু’জনের মধ্যে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠল। বাঁসায় গিয়ে চা পানের পর আলাপচারিতায় মেতে ওঠলো দু’জনে। এক পর্যায়ে ওঠে আসে নয়নের জীবনে ঘটে যাওয়া নানা সুখ-দুঃখের কাহিনী। প্রথমে কলিমকে নয়ন জিজ্ঞেস করল, ‘আপনি কী করেন ভাইয়া? কলিম বলল, ‘কবিতা লিখেই আমার জীবন চলে।’ তারপরে কলিম নয়নকে বলল, ‘তুমি কী কর ভাই? কাঁধেতো ঝোলানো ব্যাগ। দেখেতো কবি কবি চেহারা।’ নয়ন জানায়, ‘তার জন্ম বরিশাল জেলার মুলাদি উপজেলার অন্তর্গত নরসিংহ নামক নিভৃত এক পল্লী গ্রামের দরিদ্র পরিবারে। দু’ই ভাইয়ের মধ্যে নয়ন বড়। তবে সে বহুমুখি প্রতিবন্ধী। জীবিকার তাগীদে বাবার সাথে চলে আসে ঢাকায় জন্মের পরপরই। বাবা নবীনগর ক্যান্টঃ এলাকায় মুদি দোকান দেন। কিন্তু মুদি ব্যবসা ভাগ্য বদলাতে পারে নি বলে মা-বাবা উভয়ের টিউশনীতে কোন মতে চলে সংসার। প্রতিদিন সুর্য ওঠার সাথে সাথে মাশরুম ভর্তি ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে পড়ে নয়ন। পরনে জিনসেট প্যান্ট, গায়ে কালো গেঞ্জি, মাথায় ক্যাপ। সাভারের সিআরপি, রেডিও কলৌনী, নবীনগরসহ ঢাকার বিভিন্ন অলী-গলিতে মাশরুম প্রিয় মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরে মাশরুম বিক্রি এবং মাশরুমকে খাদ্য হিসেবে ব্যবহার বিষয়ে সচেতনতার জন্য।

আপন মনের টানে গায়, ‘থাকবে না কোন ঝুট ঝামেলা, মাশরুমে মাশরুমে ভরে যাবে বাংলা।’ অনেকে হাসির ছলে তাকে বলে, ‘জাতে মাতাল, কাজে তাল।’
প্রতিবন্ধী কিভাবে হয়েছে কলিম প্রশ্ন করলেই নয়নের মুখ থেকে উত্তর আসে, ‘ভাইয়া এটা কি জানা খুবই জরুরী? তাহলে বলি, শুনেন মন দিয়ে।‘মায়ের ২০ ঘণ্টা প্রসব বেদনার পরে আমার জন্ম হয় ৮৮ সালের মে মাসে দুপুর সাড়ে ১২ টায়। জন্মের পর ২ ঘণ্টা আমার শ্বাস-প্রশ্বাস ছিলো না। সবাই ভাবছিলো আমি মৃত অবস্থায় এ সুন্দর পৃথিবীতে এসেছি। কিন্তু বিধাতা আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছিল। কেনোই বা রেখেছিল তাও জানি না। রাখলেও কেন প্রতিবন্ধী বানালো সেটাও জানি না।’ কথা বলার সময় চোখ দিয়ে অঝোরে ঝরছিলো অশ্রু।তারপর আবার বলতে শুরু করলো তার প্রতিবন্ধিতা হওয়ার কথা।
‘দশ মাস বয়সে আমি টায়ফয়েড জ্বরে আক্রান্ত হয়ে প্রতিবন্ধিতার শিকার হই।এরপর দেড় বছর পর্যন্ত কথা বলতে এবং হাটতে পারিনি। সেটা কারো নজরে পড়েনি। কেউ খেয়ালও করেনি যে আমার জীবন অন্ধকারের দিকে ধাবিত হচ্ছে’।এক আত্মীয়ের পরামর্শে নয়নকে ঢাকা শহরের অবস্থিত বিভিন্ন মানসিক হাসপাতালে সুচিকিৎসার নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু পুরোপুরি সুস্থ্য হতে পারেনি নয়ন।
নিঝুম রাতে প্রতিবন্ধিতার বিড়ম্বিত জীবনের বিষাদ নিয়ে নয়ন লিখেন কবিতা। কিন্তু ওসব কবিতা প্রকাশিত হয়নি কোন পত্রিকায়। সে জানেও না কিভাবে পত্রিকায় যোগাযোগ করতে হয়। সে ৪০টি কবিতা লিখেছে। কবিতাগুলো তার ব্যাগে থাকে সবসময়। কবিতাপ্রেমী মানুষকে পড়তে বলে। সে কলিমকে বলল, ‘ভাইয়া ! কবিতার খাতাটি কি দেখবেন?’ কলিম বলল, ‘অবশ্যই দেখবো’। খাতাটি খুলার পর কলিমের নজরে পড়লো একটি কবিতা। কবিতাটি পড়ে চোখের জল ধরে রাখতে পারল না কলিম। কবিতাটির নাম ‘তরুণীর একটু ভালবাসা চাই’। কয়েকটি চরণ কবিতার,
‘আমার কোন তরুণীর বাহু ধরে হাঁটা হবে না,
কারণ, হাটতে পারি না ঠিকমত
কোন তরুণীর কাছে পত্র লেখা হবে না,
কারণ, পত্রের ভাষা আমার জানা নেই
কোন তরুণীকে বলতে পারবো না তোমাকে ভালবাসি,
কারণ, মুখের ভাষা অস্পষ্ট
কোন তরুণীকে ভালবেসে ঘরে নেওয়া সম্ভব হবে না,
কারণ, নিজস্ব ঘর নেই
তারপরেও তরুণীর একটু ভালবাসা চাই’।
কলিম জিজ্ঞেস করল, মাশরুমের ব্যবসায় কিভাবে আসলে? নয়ন জানায়, ‘সাভারের ‘বিডিসাস’ নামক বে-সরকারি সংস্থায় কাজ করতে গিয়ে আমার পরিচয় হয় আনোয়ার স্যারের সাথে। তিনি আমাকে সাভার সোবহানবাগ মাশরুম সেন্টার উন্নয়ন প্রকল্পের অধীনে সাত দিনের একটি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে দেয়। প্রশিক্ষণ শেষে ২০ প্যাকেট মাশরুম উপহার দেয়া হয় আমাকে। তখন থেকেই শুরু করে মাশরুম উৎপাদন।’ তারপর একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার কোর্ডিনেটর নয়নকে সুদ মুক্ত ৩ হাজার টাকা ঋণ দেয়। সাভারের ধলেশ্বরে তার বাড়ির আঙিনায় মাশরুমের উৎপাদন শুরু করে। যার নাম দেন ‘মাশরু পল্লী’। মাশরুম কাটা ও পানি দেওয়ার সময় বাবা-মা তাকে সাহায্য করে। কিন্তু অর্থাভাবে বড় ধরনের মাশরুম উৎপাদনের প্রকল্প হাতে নিতে পারেনি। তার এক প্রিয়জনের অকাল মৃত্যুতে সে খুবই কষ্ট পেয়েছে। কারণ, তাকে সব কাজে সহযোগিতা করতো সে। অনেক সময় আর্থিক সহায়তাও করতো। তবে পরামর্শ খুবই কাজে লাগতো। কথার ফাকে ফাকে আরো বেরিয়ে আসে নয়নের নিত্য দিনের কাজের কথা। নয়নের সখ দেশি-বিদেশী ডাক টিকিট ও মুদ্রা সংগ্রহ করা। এ পর্যন্ত দেশী ও বিদেশী ২৫০টি ডাক টিকিট ও ৫০ টি বিদেশী মুদ্রা সংগ্রহ করেছে। ওসব তার বাড়িতে অতি যতেœ সংগৃহীত রয়েছে। নতুন নতুন মসজিদে নামায পড়তেও সে খুব ভালো বাসে। এ যাবৎ সে ৩০০ মসজিদে নামাজ আদায় করেছে। সময় পেলে গীর্জায়ও যায়। কেন গীর্জায় যায় জিজ্ঞেস করল কলিম? নয়নের হাসি হাসি মুখে জবাব, ‘আমার কাছে ধর্ম হচ্ছে মানবধর্ম। কোন ধর্মের প্রতি আমার ঘৃণা নেই। সব ধর্মেই অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোকে পূণ্যের কাজ হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।’
ভ্রমণ খুবই নয়নের জন্য আনন্দদায়ক। আগামী কয়েকবছরের মধ্যে সে যদি কোন প্রতিষ্ঠান থেকে সহযোগিতা পায়, তবে ‘বাংলাদেশ চিনবো’ এই শ্লোগানকে সামনে নিয়ে ২১ ফেব্রুয়ারি, ২৬ মার্চ অথবা ১৬ ডিসেম্বর বিশেষ দিনে বেরিয়ে পড়বে সারা বাংলাদেশ ভ্রমণে। সকল বিভাগের বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সাথে সাক্ষাৎ করে তুলে ধরবেন প্রতিবন্ধিতা এবং দেশের সার্বিক সামাজিক সমস্যাসমূহ। সাথে থাকবে মাশরুমের প্রচারণা। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দর্শনীয় স্থান, শহীদদের স্মৃতি সৌধ, বিভিন্ন ধর্মের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং উপাসনালয়, উপজাতীদের জীবন চিত্র ঘুরে ঘুরে দেখবে। পাশাপাশি সচেতন করবে সাধারণ মানুষকে দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়ার, ধুমপান বিরোধী এবং দেশের উৎপাদিত পণ্য ব্যবহার করার জন্য।
উন্মুক্ত বিশ্ব বিদ্যালয় থেকে এইচএসসি পাস করেছে নয়ন। কোন বেসরকারি বা সরকারি সংস্থা বা দানশীল ব্যক্তিদের কাছ থেকে কোন উপবৃত্তি বা সহায়তা পায় নি সে। তবে কারো কাছ থেকে কোন সহযোগিতা আর চায় না। নিজের পায়ে দাঁড়ানোর জন্যই মাশরুমের ব্যবসা ধরেছে।
অক্লান্ত পরিশ্রম করে মাসরুম চাষের ওপর একটি বইও বের করেছে। বইটি সব সময় তার ব্যাগের ভেতরে থাকে। কেউ দেখতে চাইলে বা কাছে আসলে বইটি দেখিয়ে মাশরুম চাষের প্রতি উদ্বুদ্ধ করে। প্রতিদিন মাশরুম বিক্রি করে যে টাকা আয় হয় ;নিজের চলার খরচ রেখে বাকিটা সংসারে বাবা-মাকে দেয়। সে টাকা দিয়ে ছোট ভাই রিপনের পড়ার খরচ চালায়। রিপন বর্তমানে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিবিএ অনার্সে অধ্যায়ণরত।
ছোট খাট সরকারি চাকুরিরও চেষ্টা করছে। বেসরকারি সংস্থাতে চাকুরি করেছে কিন্তু সুযোগ সুবিধা কম। অপরদিকে যে কোন সময় চাকুরি চলে যায় বলে বেসরকারি চাকুরির জন্য চেষ্টা করছেনা । তারপরেও ভাল প্রতিষ্ঠানে চাকুরির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে সে ভারি কাজ করতে পারে না। কম্পিউটারও চালাতে পারে। কিন্তু চাকুরি মিলছেনা ভাগ্যে। একদিকে কথায় জড়তা, শরীরে শক্তি কম, অন্যদিকে শিক্ষিত কম।
কলিম নয়নকে প্রশ্ন করল, ‘তুমি কিসে বেশি সুখ বা দুঃখ পাও?’ নয়ন কলিমকে বলল, ‘যখন মানুষকে আনন্দ দিতে পারি তখন সবচেয়ে বেশি সুখী হই। যখন মানুষ আমাকে ভুল বুঝে তখন আমি সবচেয়ে দুঃখ পাই’। নয়নের দৃষ্টিতে বাবা-মায়ের পর প্রিয় মানুষ হচ্ছে যে, বিনা স্বার্থে অন্যের কল্যাণে কাজ করে সে মানুষ। কিন্তু কোটি কোটি মানুষের মধ্যে এমন মানুষ কয়েকজনকেই খুঁজে পেয়েছে জীবনে। তারা হলেন, ভেলরী এ টেইলর, সিআরপির প্রতিষ্ঠাতা ও সমন্বয়কারী, মরহুম মোঃ মাহবুবুল আশরাফ এবং মোঃ রূহুল আমিন, সাবেক পরিচালক, জাতীয় মাশরুম উন্নয়ন সম্প্রসারণ কেন্দ্র।
নয়ন কলিমকে বলল, ভাইয়া বিদায় নিতে হবে। ‘ভাইয়া! আসি! আবারও দেখা হবে। ফোন করবেন কিন্তু। সময় পেলে সাভারে একবার আমার বাড়িতে আসবেন’। কলিম মনে মনে ভাবল, শুধু অধ্যায়ণই প্রধান কাজ হওয়ার কথা ছিল নয়নের। কিন্তু দারিদ্র্যতার কারণেই কলেজে না গিয়ে ব্যাগে মাশরুম নিয়ে যেতে হচ্ছে সাধারণ মানুষের দ্বারে দ্বারে। মাশরুম বিক্রি করে নিজের যেমন লেখা-পড়ার খরচ চালাচ্ছে। ঠিক তেমনি লাভের কিছু অংশ তুলে দিতে হচ্ছে বাবা মায়ের হাতে। পরিবারে লেগেই আছে অভাব। অভাব যেন নিত্য দিনের সাথী নয়নের। কিন্তু কলিমের সহায়তা করার মতো সামর্থ নেই।

”নবাব বার্তা” ডটকম এ প্রকাশিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি

About Azmal Hosen Mamun

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!