সড়ক পরিবহন আইন ও আমাদের ভাবনা

সড়ক পরিবহন আইন ও আমাদের ভাবনা

টুটুল রবিউলঃ

সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮, ১ নভেম্বর হতে কার্যকর হয়েছে। নতুন এই আইনে জরিমানা কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেয়ার কারণে এ নিয়ে চলছে গুঞ্জন।কোন কোন ক্ষেত্রে জরিমানার হার ১০% হতে ৫০% পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়েছে।সাথে কারাদন্ডেরও ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। অনেকে এ আইন নিয়ে করছে বিরুপ মন্তব্য।পুলিশ প্রশাসন এরই মধ্যে সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ নিয়ে তাদের অবস্থান পরিস্কার করেছে।

বিজ্ঞাপন

১ নভেম্বর থেকে কার্যকর হওয়া (প্রচারণার জন্য ৭ দিন জরিমানা বন্ধ রাখা হয়েছে) নতুন আইনে বিভিন্ন অনিয়মের জন্য জরিমানার পরিমান পাঁচ থেকে ৫০ গুণ বাড়ানো হয়েছে৷ উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আগের আইনে যত্রতত্র হাইড্রোলিক হর্ন বাজালে ২০০ থেকে ৫০০ টাকা জরিমানার বিধান ছিলো৷ এখন তা করা হয়েছে ১০ হাজার টাকা জরিমানা অথবা তিন মাসের কারাদণ্ড অথবা উভয় দণ্ড৷

এই আইনে শুধু চালক ও পরিবহন মালিক নয়, এবার পথচারীদেরও শাস্তির আওতায় আনা হয়েছে৷ চালককে সংকেত মানতে হবে৷ পথচারীকেও সড়ক, মহাসড়কে জেব্রা ক্রসিং, ওভার ব্রিজ, আন্ডার পাস ব্যবহার করতে হবে৷ যত্রতত্র রাস্তা পার হলে পথচারীকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা গুনতে হবে৷

ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো চালক যদি দুর্ঘটনার মাধ্যমে কোনো ব্যক্তির প্রাণহানি ঘটান তাহলে তার বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায়ই মামলা হবে৷ এর সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড৷ তবে দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর জন্য চালকদের সর্বোচ্চ শাস্তি পাঁচ বছর এবং এই অপরাধ জামিন অযোগ্য৷ আগে এই অপরাধে সর্বোচ্চ শাস্তি ছিলো তিন বছরের কারাদণ্ড এবং জামিনযোগ্য৷ 

আইনের নতুন কিছু দিক

ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া কেউ যানবাহন চালালে তার শাস্তি ছয় মাসের কারাদণ্ড বা ২৫ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড৷ নিবন্ধনহীন যানবাহনের জন্য শাস্তি ছয় মাসের কারাদণ্ড এবং ৫০ হাজার টাকা জরিমানা৷ যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং এর জন্য পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা৷ উল্টো পথে গাড়ি চালালেও জরিমানা গুনতে হবে৷ এছাড়া ফিটনেস, রেজিস্ট্রেশন এসব বিষয়েও জরিমানা অনেক বাড়ানো হয়েছে৷

গাড়ি চালানো অবস্থায় মোবাইল ফোনে কথা বললে ২৫ হাজার টাকা জরিমানা৷ অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করলে এক মাসের জেল ও ১০ হাজার টাকা জরিমানা আদায়ের বিধান রয়েছে৷

আর দুর্ঘটনায় আহতদের ক্ষতিপূরণ দিতে আদেশ দিতে পারবে কর্তৃপক্ষ৷ চালকদের সর্বনিম্ন বয়স হতে হবে ১৮ বছর৷ আইনটি মোটরবাইক থেকে শুরু করে সব ধরনের যান্ত্রিক যানবাহনের জন্য প্রযোজ্য হবে৷

এই সড়ক পরিবহন আইন নিয়ে হতাশ হবার কারণ নাই। কারণ আপনি যদি শতভাগ আইন মেনে চলেন তাহলে কোন সমস্যা হবার কথা নয়। এখানে আপনাকে আমাকে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে।আপনি যদি একটি গাড়ির যাবতীয় কাগজপত্র সঠিকভাবে উপস্থাপন করতে পারেন, আপনার যদি ড্রা্ইভিং লাইসেন্স থাকে, আপনি যদি আপনার নিরাপত্তার জন্য হেলমেট ব্যবহার করেন, আপনি যদি আপনার নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে অতিদ্রুত গতিতে গাড়ি না চালান, আপনি যদি অপরের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করেন, আপনি যদি দেশের সৌন্দর্যের কথা চিন্তা করে যত্রতত্র্র গাড়ি পার্কিং না করেন, আপনি যদি কোন আইন ভঙ্গ না করেন, তাহলে এ আইনে আপনাকে নিরাপত্তা প্রদাণ করতে বদ্ধ পরিকর।নির্দেশিত আইন মেনে চললে জরিমানা ১ টাকা হোক আর ১ লক্ষ টাকা হোক তাতে আপনার কিছু যায় আসেনা।

কিন্তু আপনি রাস্তায় গাড়ি নিয়ে বের হলেন, কিন্তু সাথে কোন কাগজপত্র নিলেন না, ফিটনেস বিহীন গাড়ি ব্যবহার করছেন, মোটর সাইকেল চালাচ্ছেন কিন্তু হেলমেট ব্যবহার করছেন না, যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং করছেন আর দোষ দিবেন আইনের, এ কেমন করে হয়!

কিন্তু কথা থেকে যায়!

জনগণ সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ মানতে শতভাগ প্রস্তুত যদি হয় তাহলে দেশ তথা সরকার কি আদৌ প্রস্তুত আছে কিনা?

সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ মানতে গিয়ে সাধারণ জনগণ কোন সমস্যায় পড়বে কিনা?

যদি বলি ড্রাইভিং লাইসেন্সের কথা। নতুন ড্রাইভিং লাইসেন্স করতে গিয়ে কতটা ঝামেলায় পড়তে হয় তা ভুক্তভোগীসহ আমরা সকলেই জানি। ঘুষ ছাড়া ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়া যায়না। ভেরিফিকেশনের নামে হয়রানিতো আছেই।

যত্রতত্র গাড়ি পাকিং করলে মোটা অংকের জরিমানা গুনতে হবে। আমি বা আমরা যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং করতে চাইনা। কিন্তু সরকার বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কি আমাদের পার্কিং করার নির্দিষ্ট জায়গা বরাদ্দ দিয়েছে? মার্কেটগুলোতে তো কোন পার্কিং জায়গা নেই। কোন কোন মার্কেটে থাকলেও সেখানে মার্কেট দোকান মালিকদের গাড়ি ধরেনা। ক্রেতা বা জনগণ কোথায় তার গাড়ি পার্কিং করবে?

শহরের বহুতল ভবন গুলোতেও পার্কিং সুবিধা খুব কম। যে কয়টি বহুতল ভবনের পার্কিং সুবিধা আছে, তা অপ্রতুল। কোন কোন বিল্ডিংয়ের পার্কিং গুলো গোডাউন হিসেবে ভাড়া দেয়া হয়ে থাকে। এগুলো দেখবে কে?

চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরে যে কয়টি ব্যাংকের শাখা রয়েছে, তাতে কারও পার্কিং সুবিধা নাই। আবার যে কয়টির হয়তোবা আছে তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল।

এজন্য তো জনগণ দায়ি নয়! যেহেতু জনগণ পার্কিং সুবিধা পাচ্ছেনা, সেহেতু জনগণ যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং করতে বাধ্য হচ্ছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে কেন্দ্রীয় বাস ও ট্রাক টার্মিনাল তৈরী হলেও তা  ব্যবহার হচ্ছেনা।বাস-ট্রাক মালিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলো মহাসড়কে যাত্রী উঠানামা করছে। যা পার্কিং আইনের পরিপন্থী। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কি পারবে বাস-ট্রাক মালিক ও শ্রমিক সংগঠনকে বাধ্য করতে বাস ও ট্রাক টার্মিনাল ব্যবহার করাতে!

জেলা শহরের একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় “এক্সিম ব্যাংক ‍কৃষি বিদ্যালয়”টি শহরের ব্যস্ততম মোড় বড় ইন্দারামোড়ে অবস্থিত। এই বিশ্ববিদ্যালয়টি চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার গর্ব।বিশ্ববিদ্যালয়টির ছাত্র-ছাত্রী ও শিক্ষকদের যাতায়াতের সুবিধার্থে দুইটি মিনিবাস আছে। আছে ভিসির প্রাইভেট কার। ছাত্ররা অনেকেই নিজস্ব মোটর সাইকেলে যাতায়াত করে। কিন্তু এই বিশ্ববিদ্যালয়টির নেই কোন পার্কিং সুবিধা।বাস ‍দুটি রাখা হয় ছোট বাচ্চাদের খেলার মাঠ পৌরভবন মাঠে। এই মাঠে আরও অনেকে তাদের ব্যক্তিগত গাড়িও পার্কিং করে। যার ফলে পৌরসভার পাশেই অবস্থিত প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরাসহ স্থানীয় ছেলেরা খেলাধুলা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।নতুন সড়ক পরিবহন আইনে এর কি কোন বিহীত আছে?

শহরের পুরাতন বাজারের রাস্তাগুলো সকলের চেনা। রাস্তাগুলো বৃটিশ বা পাকিস্তান আমলের। এই রাস্তাগুলোতে দুইটি রিক্সা ক্রসিং করা কষ্টসাধ্য। তারপরও রাস্তার পার্শ্বের দোকান মালিকরা রাস্তা দখল করে দোকানের মালপত্র রাখে? যার কারণে চলাচলে ভোগান্তির শিকার হতে হয় পথচারীসহ মোটরসাইকেল ও রিক্সা যাত্রীদের।এ পরিপ্রেক্ষিতে নতুন সড়ক পরিবহন আইন -২০১৮ কাকে দায়ী করে জরিমানা আদায় করবে? নতুন আইনে আছে কি এর কোন প্রতিকার?

বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হলেও এখনও অনেকে ফুটপাতে ব্যবসা করে তাদের জীবন-জীবিকা নির্বাহ করে। কিন্তু ফুটপাত দখল করে ব্যবসা করার কারণে পথচারীরা সড়কে নেমে পড়তে বাধ্য হয়। যার ফলে অনেক সময় অনাকাঙ্খিত দুর্ঘটনা ঘটে!

সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধ করা এ আইনের অন্যতম একটি এজেন্ডা।সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ বাস্তবায়নে ফুটপাত দখলমুক্ত করা অতীব জরুরী। সরকার কি আদৌ পারবে ফুটপাত দখলমুক্ত করতে? আর পারলেও গরীব ফুটপাত ব্যবসায়ীরা কি করবে. তাদের সংসার কিভাবে চালাবে? সরকার কি তাদের কোন বিকল্প ব্যবস্থা করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে?

এই আইনে শুধু চালক ও পরিবহন মালিক নয়, এবার পথচারীদেরও শাস্তির আওতায় আনা হয়েছে৷ চালককে সংকেত মানতে হবে৷ পথচারীকেও সড়ক, মহাসড়কে জেব্রা ক্রসিং, ওভার ব্রিজ, আন্ডার পাস ব্যবহার করতে হবে৷ যত্রতত্র রাস্তা পার হলে পথচারীকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা গুনতে হবে৷এটা কি আদৌ সম্ভব? পথচারীদের জন্য দেশের মহাসড়কগুলোতে কি ওভার ব্রিজ, আন্ডার পাসের ব্যবস্থা করা হয়েছে?

সর্বোপরি বলতে হয়, যে দেশের মানুষ দেশের আইনের প্রতি যতটা আন্তরিক সে দেশ ততটাই উন্নত। আমরা ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য এদেশকে আধুনিক উন্নত রাষ্ট্র রেখে যেতে চাই।

*সরকারকে স্বল্পমুল্যে/স্বল্প সময়ের মধ্যে ড্রাইভিং লাইসেন্সের ব্যবস্থা করে দিতে হবে?

*সরকার যদি পার্কিং এর জায়গা না দিতে পারে তাহলে জনগণ কেন পার্কিং জরিমানা দেবে?

*সরকার যদি ওভার ব্রিজ আর আন্ডার পাস না দিতে পারে তাহলে জনগণ কেন জরিমানা দেবে?

এবিষয়ে একটা দেশের জনগণের নায্য অধিকার পুরণ করার দায়িত্ব সরকারকে নিতে হবে।

আমরা জানি আইন তৈরী হয়-জনগণের সর্বদিক বিবেচনা করে। আর তাই, যদি সরকার জনগণের চাহিদা পুরণে সক্ষম হয় তাহলে এ সড়ক পরিবহন আইন -২০১৮ বাস্তবায়ন করা সম্ভব। তা নাহলে এনিয়ে সরকার আর জনগণের মধ্যে তিক্ততা বাড়ার সমুহ সম্ভাবনা আছে।বাস্তবায়নেও জটিলতা দেখা দিতে পারে।

লেখকঃ সাংবাদিক, কলামিষ্ট।